২০১৯ সালের ১৭ আগস্ট, সান্ধ্যপ্রদীপ আয়োজনের মধ্য দিয়ে রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএমের সাথে পথচলা শুরু। দেখতে দেখতে ছয়টি বছর পেরিয়ে গেছে। কথাবন্ধুদের ভালোবাসা ও তাদের অনুপ্রেরণায় এগিয়ে যাচ্ছি। অনেকে যখন প্রশ্ন করে, আধুনিক যুগে এসে তুমি কেন অ্যানালগ যুগের রেডিওর প্রতি আসক্ত। কোনো উত্তর দিতে পারি না। আবার বলি— বিনোদন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, তথ্য ইত্যাদি পেয়ে থাকি।
বরেন্দ্র রেডিও, রেডিও বড়াল, রেডিও পদ্মা, রেডিও মহানন্দা, রেডিও বিক্রমপুর, রেডিও সারাবেলা, রেডিও পল্লিকণ্ঠ— কমিউনিটি রেডিও নিয়ে আমার রেডিও জগৎ। আসলে কমিউনিটি রেডিও থেকে আমরা কী পাই? হিসাবের সংখ্যায় ৭টি উপকার হয়। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এখনো কেন বেশ কয়েকটা কমিউনিটি রেডিও লাইসেন্স পাওয়ার অপেক্ষায় আছে। নবউদ্যোগে সৃজনশীল কার্যক্রম নিয়ে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবিক মূল্যবোধ, সচেতনতা-সংস্কৃতি উন্নয়ন ও বিকাশে কতটুকু ভূমিকা পালন করে আসছে?
কমিউনিটি রেডিও হচ্ছে কমিউনিটিভিত্তিক রেডিও। এই গণমাধ্যমে দরিদ্র এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজেদের কথা সরাসরি বলার সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে কণ্ঠহীনদের কণ্ঠস্বর সোচ্চার হওয়া ও শোনার সুযোগ। সংবাদ, তথ্য বিনোদন, নাটক, জীবিকা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা অর্থাৎ স্থানীয় সব বিষয়ে প্রচার প্রক্রিয়ায় এলাকাবাসী সরাসরি অংশগ্রহণ করে।
এতে উপকার হচ্ছে কতটুকু? কমিউনিটির ভেতর থেকেই নারী ও দলিতদের বাছাই করা হয় ফেলোশিপের জন্য। এর মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদের নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন। সবগুলো কমিউনিটি রেডিওতেই কমিউনিটির নারীরা স্বেচ্ছাসেবক এবং নিজস্ব কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। এমনকি একাধিক কমিউনিটি রেডিও স্টেশনের ম্যানেজার, সংবাদ ও অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান হচ্ছেন নারী— যারা ওই কমিউনিটিরই মানুষ। আর সংবাদ ও অনুষ্ঠানের বিষয়ও স্থানীয় সমস্যা, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ; জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো কোনো বিষয় নিয়ে সংবাদ ও অনুষ্ঠান নির্মিত হলেও সেটির সঙ্গে ওই কমিউনিটির স্বার্থযুক্ত রয়েছে কিনা তা বিশেষভাবে খেয়াল রাখা হয়।
এতে কণ্ঠস্বর ভেসে উঠবে দেশের প্রান্তিক মানুষের। কিন্তু আসল কথা হলো, কমিউনিটি রেডিও স্টেশনগুলো এত দিনেও স্থানীয় জনগণের নিজস্ব হয়ে দাঁড়াল না। স্থানীয় জনগণও সম্ভবত এ কারণেই কান ফিরিয়ে নিয়েছে।
রেডিও মহানন্দার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, বেজে উঠার ১৫ বছর
আজ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার একমাত্র কমিউনিটি রেডিও ‘রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম’র ১৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। বাংলাদেশের ১৮টি জেলায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সেবা, সচেতনতা, বিনোদন এবং তাদের কণ্ঠস্বর হিসেবে আজ পর্যন্ত ১৯টি কমিউনিটি রেডিও স্থাপন করা হয়েছে।
আজ থেকে ঠিক ১৪ বছর আগে হাসিব ভাইয়ার হাত ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বুকে বাংলাদেশের ৫ম কমিউনিটি রেডিও হিসেবে পথচলা শুরু করে রেডিও মহানন্দা। হাঁটি হাঁটি পা করে ১৪টি বছর পেরিয়ে আজ ১৫ বছরে পদার্পণ করল। এই দীর্ঘ সময় ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষা, বিনোদন, ঐতিহ্য, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, হারানো সংস্কৃতি বিভিন্নভাবে তুলে ধরেছে রেডিওটি। শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা নয়, নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বেশ কিছু গ্রাম, রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলার বেশ কিছু গ্রাম, ভারতের মুর্শিদাবাদ এলাকা থেকেও শোনা যায় রেডিও মহানন্দা।
নারী শিক্ষা ও সহিংসতা প্রতিরোধ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে, যুবদের উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা তৈরি ইত্যাদি ক্ষেত্রে রেডিও মহানন্দা প্রচার করে চলেছে। এতে করে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারী, শিশু, সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠী ও দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের সমস্যাগুলো প্রতিফলিত হয়েছে। সমাজে সংস্কৃতি ও সচেতনতা কয়জন তুলে ধরে? সামাজিক কর্মকাণ্ড ও সেবামূলক বিষয়গুলো জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানাই রেডিও মহানন্দার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাসিব হোসেন ভাইয়াকে ।
রেডিও আয়োজন নিয়ে কিছু বলার নেই, তবুও কেন জানি বারবার বলতে ইচ্ছে করে। ‘চিরদিনের সুর’ ও ‘লগড়্যা পাঁচ ফোড়ং’ আয়োজনের জন্যই আমি এখনো রেডিও মহানন্দার সাথে আছি। ‘মন মাঝি’, ‘ওয়ার্ল্ড মিউজিক এক্সপ্রেস’, ‘রসের হাঁড়ি’ ইত্যাদি আয়োজনগুলো সবসময় ভালো কিছু দিয়ে আসছে শ্রোতাদের।
দৈনিক জনকণ্ঠের তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে ২০টি কমিউনিটি রেডিও প্রতিদিন ১৩৫ ঘণ্টারও বেশি সময় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। ১ হাজার তরুণের অংশগ্রহণে নতুন ধারার এ গণমাধ্যমটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ১৮টি জেলার ১২৭টি উপজেলার প্রায় ৬৭ লাখ জনগোষ্ঠী কমিউনিটি রেডিওর সুবিধা ভোগ করছে বলে জানিয়েছে বিএনএনআরসি। কমিউনিটি রেডিও স্টেশন পর্যায়ে সাড়ে ৫ হাজার ‘শ্রোতা ক্লাব’ গঠিত হয়েছে শ্রোতাদের সমন্বয়ে।
উন্নয়ন বিষয়ক নানা ইস্যুতে কমিউনিটি রেডিওগুলো মানুষকে তথ্য সহায়তা দিয়ে যেভাবে ক্ষমতায়িত করছে, সেটি নিয়ে মূলধারার গণমাধ্যমে আরো বেশি আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। সেই সঙ্গে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্থানীয় পর্যায়ের বেতারকর্মীরা অনেকটা বিনাশ্রমে যেভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি নিজেদের দায়বদ্ধতার পরিচয় দিচ্ছেন, সেটির আর্থিকমূল্য না হোক, অন্তত মৌখিক স্বীকৃতিটুকু তাঁদের প্রাপ্য।
কল্যাণমূলক সম্প্রচারমাধ্যম, যার মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় থাকে তৃণমূল পর্যায়ের জনগোষ্ঠী। এটি মূলত অলাভজনক ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, কমিউনিটিকে সেবা প্রদান করা এবং স্থানীয় লোকজ, আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন-বিকাশের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। কমিউনিটি রেডিও নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র ভৌগোলিক এলাকার জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে কাজ করে। এটি কমিউনিটির নিজস্ব সম্পদ, যা একটি জনপদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণা, বিচার-বিবেচনা ও চিন্তা-চেতনার যথাযথ প্রতিফলন ঘটায়।
চিঠি পাঠানোর অনুভূতি
আমি ছয় বছরে অনেক হাতে লেখা, কম্পিউটার কম্পোজ করা চিঠি এবং ইমেইল পাঠিয়েছি। অনেক অনেক তথ্য জানতে চেয়েছি। আবার অনেক অনেক তথ্য পাঠিয়েছি। কখনো অনুষ্ঠান বিষয়ে আবার কখনো অনুষ্ঠানের মতামত জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। রেডিও মহানন্দার ভালো লাগা, খারাপ লাগা সব বলেছি। ছোট ছোট রঙিন কাগজে লিখে, চিঠির রঙিন খামে ভরে চিঠি পাঠাতে আমার অনেক ভালো লাগে। আজকাল মানুষ চিঠি লিখে কম। জরুরি সিভি বা জরুরি কাগজপত্র পাঠাতে মানুষ চিঠি লিখা বা চিঠির খামে গন্তব্যে পাঠায়। কুরিয়ারের মাধ্যমে কাগজপত্র পাঠানো যায় বলে মানুষ পোস্ট অফিসে না গিয়ে কুরিয়ারে কাছে যায়। সবাই ডিজিটাল হলেও আমি এখনো অ্যানালগ যুগে পড়ে আছি। এখনো নিয়মিত চিঠি পাঠাই। রেডিওর বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে পছন্দের গান শোনার জন্য, নিজের মতামত জানাতে, অনুষ্ঠান সম্পর্কে বলতে আবার কথাবন্ধুর সাথে জমিয়ে আড্ডা দিতে চিঠি পাঠাই। একমাত্র আমিই, যে এখনো চিঠি লিখি।
শুধু রেডিও মহানন্দা নয়, আরো ৫টি কমিউনিটি রেডিওতে গান শোনার জন্য এবং মতামত জানাতে নিয়মিত চিঠি লিখি। এখন যেমন চিঠি লেখাটা বিনোদনের খোরাক হয়ে উঠেছে। আমি যেমন আমার বিনোদনটা রেডিওর মাধ্যমে পেয়ে থাকি। আমাদের সকল চাওয়া-পাওয়া পূরণ করে, ভালোবাসার আধুনিকতা ছড়িয়ে শ্রোতাদের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতে পারা যেমন আপনাদের সার্থকতা; ঠিক তেমনি শ্রোতারা তাদের ভালোবাসার চাদরে রঙিন পরশে জড়িয়ে ছায়ার মতো আপনাদের পাশে আছে সবসময়। সব ধরনের বাধা, বিপত্তি প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এগিয়ে চলেছে আগামীর দিকে।
আজকের এই আনন্দের দিনে আবারো রেডিও মহানন্দাকে জানাই জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা। শুভ জন্মদিন রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম। লাখ লাখ শ্রোতার প্রাণে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকুক— এটাই প্রত্যাশা করি এফএম পোকা-২০২৫
মো. আলি হাসান : সম্পাদক, এফএম পোকা শ্রোতা ফোরাম ও সোনামসজিদ, শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ